স্পিডবোটটা যখন মেঘনার বুক চিরে চর ফ্যাশনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন দূর থেকে দ্বীপটাকে দেখে প্রথম যে কথাটা মনে হলো—এত সমতল একটা জায়গা সত্যিই কীভাবে টিকে থাকে? চারপাশে পানি, সামনে ধূসর-সবুজ এক ফালি জমি, আকাশের নিচে প্রায় লুকিয়ে থাকা ঘরবাড়ি। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, দ্বীপটা যেন নদীর ওপর আলতো করে রাখা—একটু বড় ঢেউ এলেই বুঝি সরে যাবে।
ঘাটে নামার পর বাতাসে নোনা পানির গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ, আর দূরে কোথাও শুকাতে দেওয়া জালের গন্ধ মিশে ছিল। আমি গবেষক হিসেবে গিয়েছিলাম, কিন্তু প্রথম দশ মিনিটেই বুঝলাম—এখানে আমি মূল চরিত্র না। এই জায়গার গল্প বলার অধিকার তাদের, যারা প্রতিদিন জোয়ার-ভাটা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন আর নতুন চরের জন্ম-মৃত্যুর সঙ্গে বেঁচে থাকে। আমি শুধু অতিথি, শুনতে এসেছি।
হিরো ইমেজ ক্যাপশন: চর ফ্যাশনের খোলা উঠানে মাটির ওপর বিছানো বড় কাগজের মানচিত্র ঘিরে বসে আছেন নারী-পুরুষ, শিশু ও প্রবীণরা—কেউ আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন, কেউ রঙিন কলমে আঁকছেন, আর গবেষক দল পাশে বসে শুনছে।
বিকেলের দিকে কমিউনিটি ম্যাপিংয়ের জন্য সবাই জমতে শুরু করলেন। জায়গাটা ছিল এক স্থানীয় বাড়ির উঠান—পাশে নারকেল গাছ, দূরে ছোট রাস্তা, আর উঠানের এক পাশে কয়েকটা শিশু দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে আমাদের দেখছে। আমরা বড় একটা কাগজের বেস ম্যাপ মাটির ওপর বিছিয়ে দিলাম। তাতে কিছু রাস্তা, নদীর রেখা, বাজার, আর কয়েকটা পরিচিত জায়গা ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, ম্যাপটা তখনও ফাঁকা লাগছিল। কারণ সেখানে মানুষের স্মৃতি ছিল না।
প্রথমে সবাই একটু চুপচাপ। কেউ কেউ দূর থেকে দেখছিলেন। তারপর একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বললেন, “এই রাস্তা তো এখন আর এইখানে নাই।” আর সেই এক বাক্যেই ম্যাপটা জীবন্ত হয়ে উঠল।
তারপর শুরু হলো সবচেয়ে সুন্দর অংশ—আঙুল দিয়ে দেখানো, স্মৃতি দিয়ে সংশোধন, আর হাসিমুখে তর্ক। একজন বলছেন, পুরনো ঘাটটা আরও দক্ষিণে ছিল। আরেকজন বলছেন, না, ঘূর্ণিঝড়ের পর রাস্তা ঘুরে গেছে। কেউ বলছেন, এই খালটা বর্ষায় নৌকা চলার মতো হয়, শীতে প্রায় শুকিয়ে যায়। কেউ আবার বলছেন, সরকারি ম্যাপে যে জায়গাটাকে খালি দেখানো হয়েছে, সেখানে আসলে তিন মৌসুম ধরে মানুষ চাষ করছে।
বয়স্ক মানুষদের মধ্যে ছোট ছোট মতভেদ হচ্ছিল, কিন্তু সেটা কোনো ঝগড়া না—বরং ম্যাপকে আরও সত্যি বানানোর চেষ্টা। আমি বুঝতে পারছিলাম, এখানে “ঠিক জায়গা” মানে শুধু GPS পয়েন্ট না; ঠিক জায়গা মানে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, আর বহু বছরের দেখা-শোনার যোগফল।
শিশুরা প্রথমে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর আমরা কয়েকটা রঙিন কলম তাদের হাতে দিতেই তারা ম্যাপের কাছে এসে বসে পড়ল। এক ছোট মেয়ে তার স্কুলে যাওয়ার রাস্তা আঁকতে শুরু করল। সে বলল, বর্ষার সময় এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় না, তখন তারা বাঁশের সাঁকো ঘুরে যায়। আরেকজন ছেলে দেখাল কোথায় মাঠে ফুটবল খেলে, আর কোথায় বর্ষায় পানি জমে যায়।
এই অংশটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। কারণ অফিসিয়াল ম্যাপে স্কুলের একটা বিন্দু থাকতে পারে, কিন্তু শিশুর হাঁটার পথ থাকে না। রাস্তার পাশে কাদা, বর্ষার বিকল্প পথ, কোথায় ভয় লাগে, কোথায় বন্ধুরা অপেক্ষা করে—এসব তো মানচিত্রে সাধারণত আসে না। অথচ একটা শিশুর জীবনে এগুলোই বাস্তব ভূগোল।
কমিউনিটির মানুষ যে জিনিসগুলো তাদের মানচিত্রে রাখতে চাইলেন, সেগুলো ছিল খুবই অর্থবহ:
- বর্ষায় ডুবে যাওয়া রাস্তা ও বিকল্প চলাচলের পথ
- পুরনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং নতুন নিরাপদ জায়গা
- নদীভাঙনের পুরনো ও বর্তমান রেখা
- মিঠা পানির পুকুর ও নলকূপ
- শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথ
- মাছ ধরার ঘাট, জাল শুকানোর জায়গা ও মৌসুমি বাজার
একসময় এক বৃদ্ধা নারী ধীরে ধীরে ম্যাপের পাশে এসে বসলেন। তিনি খুব বেশি কথা বলছিলেন না। কিন্তু ২০০৭ সালের বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কথা উঠতেই তিনি হাত বাড়িয়ে ম্যাপের একটা জায়গায় আঙুল রাখলেন। তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু কথাগুলো খুব ভারী।
“এইখান পর্যন্ত পানি উঠছিল। ওই তালগাছটার মাথা দেখা যাইত, কিন্তু ঘরের চাল দেখা যাইত না। আমরা এই দিক দিয়া দৌড়াইয়া স্কুলের বারান্দায় উঠছিলাম।”
তিনি যখন বলছিলেন, আশেপাশের সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল। ম্যাপের ওই ছোট্ট জায়গাটা হঠাৎ একটা স্মৃতির দরজা হয়ে গেল। কাগজের ওপর একটা বিন্দু আর শুধু বিন্দু থাকল না; সেটা হয়ে গেল ভয়, বেঁচে থাকা, হারানো জিনিস, আর ফিরে আসার গল্প।
সেদিন আমার নিজের ধারণাটাও বদলে গেল। আগে ভাবতাম, participatory mapping মানে মানুষকে দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা—কোথায় রাস্তা, কোথায় খাল, কোথায় ঘর। কিন্তু চর ফ্যাশনে বসে বুঝলাম, এটা শুধু data collection না। এটা বিশ্বাস তৈরির কাজ। এটা এমন একটা জায়গা তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজের ভাষায় নিজের ভূগোল বলতে পারে।
মানচিত্র এখানে গবেষকের টুল না; এটা কমিউনিটির আয়না। কেউ নিজের হারানো জমি দেখায়, কেউ নিরাপদ পথ দেখায়, কেউ সন্তানের স্কুলের রাস্তা আঁকে। আর এসব একসঙ্গে মিলে তৈরি করে shared memory—একটা সম্মিলিত স্মৃতি, যা শুধু রিপোর্টে রাখা যায় না, মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে।
ওয়ার্কশপ শেষে আমরা ম্যাপটা গুটিয়ে সঙ্গে নিয়ে চলে আসিনি। আগে সবার সঙ্গে বসে ছবি তোলা হলো, তারপর ম্যাপের একটি কপি স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে রাখার সিদ্ধান্ত হলো। আরেকটি কপি ডিজিটাল করে পরে প্রিন্ট দিয়ে দেওয়ার কথা হলো, যাতে স্কুল, ইউনিয়ন অফিস আর স্থানীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটি ব্যবহার করতে পারে।
ফেরার সময় স্পিডবোটে বসে চর ফ্যাশনকে আবার দূরে সরে যেতে দেখছিলাম। আগের মতোই সমতল, নরম, নদীর ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক দ্বীপ। কিন্তু এবার সেটা আর শুধু একটা ভৌগোলিক স্থান মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, এই দ্বীপের প্রতিটি রাস্তা, ঘাট, পুকুর, ভাঙনরেখা আর স্কুলপথের পেছনে কারও না কারও গল্প আছে।
আর সেই গল্পগুলো মানচিত্রে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।














Responses (0 )