ভোর ৫টা। অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে গেল। জানালার বাইরে তখনও আলো পুরোপুরি ফোটেনি, কিন্তু আমার মাথার ভেতর যেন পুরো একটা বন জেগে গেছে। আজ আমাদের ফিল্ড ট্রিপ—লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ব্যাগ গোছাতে বসে মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো ছোটখাটো অভিযানে যাচ্ছি। নোটবুক, কলম, পানির বোতল, ক্যাপ, পাওয়ার ব্যাংক, শুকনো খাবার, আর অবশ্যই মোবাইল—সব ঢুকিয়ে ফেললাম ফিল্ড ব্যাগে।
বাসে উঠতেই দেখি সবাই আমার মতোই আধা ঘুম, আধা উত্তেজনায় আছে। কেউ সিট দখল করছে, কেউ জানালার পাশে বসার জন্য ছোটখাটো কূটনীতি চালাচ্ছে, কেউ আবার বাস ছাড়ার আগেই চিপস খুলে ফেলেছে। আমাদের ক্লাসের রাফি বলল, “আজকে যদি গিবন দেখি, আমি কিন্তু সারাজীবন সবাইকে বলব।” তখন আমরা সবাই হেসে উঠলাম। কে জানত, কথাটা পরে সত্যি সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে!
—
শহর পেছনে ফেলে বাস যখন ধীরে ধীরে সিলেটের দিকে এগোচ্ছিল, জানালার বাইরের দৃশ্য বদলাতে শুরু করল। রাস্তার দুই পাশে চা-বাগান, ছোট ছোট বাজার, কুয়াশা-ঢাকা সকাল, আর দূরে সবুজ পাহাড়ের রেখা। আমাদের শিক্ষক মাঝে মাঝে মাইকে ছোট ছোট কথা বলছিলেন—লাউয়াছড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, বরং একটা জীবন্ত ব্যবস্থা।
আমি জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিলাম, বইয়ের পাতায় “রেইনফরেস্ট” শব্দটা যতটা সুন্দর লাগে, বাস্তবে সেটা কেমন হবে? গরম, ভেজা, অন্ধকার? নাকি সিনেমার মতো রহস্যময়?
লাউয়াছড়ার কাছে পৌঁছানোর পর প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ল, সেটা হলো বনের প্রান্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, গাছগুলো একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একটা সবুজ দেয়াল বানিয়ে রেখেছে। যেন ভেতরে ঢুকতে হলে অনুমতি নিতে হবে। বাস থেকে নামতেই বাতাসের গন্ধ আলাদা লাগল—মাটির গন্ধ, পাতা পচে যাওয়ার গন্ধ, ভেজা কাঠের গন্ধ। শহরের ধুলো-মিশ্রিত বাতাসের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।
ছবি ক্যাপশন: হিরো ইমেজ: লাউয়াছড়ার ঘন সবুজ বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছে ভূগোল বিভাগের শিক্ষার্থীরা—ব্যাগ কাঁধে, চোখে কৌতূহল, সামনে সরু বনপথ।
—
বনের ভেতরে ঢোকার মুহূর্তটা আমি সহজে ভুলব না। বাইরে রাস্তার শব্দ, মানুষের কথা, গাড়ির হর্ন—সব যেন এক ধাপে কমে গেল। তার বদলে চারপাশে শুরু হলো অন্য এক ধরনের শব্দ। পাখির ডাক, পাতার ঘষাঘষি, দূরে অজানা কোনো প্রাণীর আওয়াজ, আর আমাদের পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ।
ক্যানোপির নিচে ঢুকতেই আলোও বদলে গেল। সূর্যের আলো সরাসরি পড়ছে না, পাতার ফাঁক দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে আসছে। কোথাও সবুজ, কোথাও সোনালি, কোথাও আবার একটু অন্ধকার। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন একটা বিশাল প্রাকৃতিক ঘরের ভেতর হাঁটছি।
আমাদের প্রফেসর হঠাৎ থামলেন। আমরা ভাবলাম, হয়তো বিশ্রাম। কিন্তু তিনি একটা গাছের গোড়ার দিকে ইশারা করে বললেন, “এটা দেখো। শুধু গাছ দেখলে হবে না, গাছের আশেপাশের সম্পর্কও দেখতে শিখতে হবে।”
আমরা কাছে গিয়ে দেখি, গাছের গায়ে লতা জড়ানো, পাশে ছোট ছোট চারা, নিচে পচা পাতা, আর কিছু পিঁপড়ার চলাচল। একা হলে আমি হয়তো শুধু একটা গাছ দেখেই চলে যেতাম। কিন্তু সেদিন বুঝলাম, ভূগোল মানে শুধু মানচিত্র না; ভূগোল মানে সম্পর্ক দেখা—মাটি, গাছ, প্রাণী, মানুষ, জলবায়ু—সব একসঙ্গে।
—
লাউয়াছড়ায় গিয়ে আমি যে ৫টা জিনিস জেনে সত্যিই অবাক হয়েছি:
- হুলুক গিবন শুধু সুন্দর প্রাণী না, বনের স্বাস্থ্য বোঝারও একটা বড় সংকেত। তারা গাছের মাথায় থাকে, আর তাদের উপস্থিতি মানে বন এখনও জীবন্ত।
- লাউয়াছড়া শুধু “জঙ্গল” না—এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবশিষ্ট রেইনফরেস্টগুলোর একটি।
- এখানে অনেক উদ্ভিদ আছে যেগুলো সাধারণ চোখে আলাদা করে বোঝা যায় না, কিন্তু বাস্তুতন্ত্রে তাদের ভূমিকা বিশাল।
- “ডিপ্টেরোকার্প ফরেস্ট” শব্দটা আগে কঠিন লাগত, কিন্তু বাস্তবে এটা বুঝলাম উঁচু, সোজা, বিশাল গাছের এক বিশেষ বন-জগত।
- বনের নীরবতা আসলে নীরবতা না—এটা হাজার রকম ছোট ছোট শব্দের মিশ্রণ। শুধু মন দিয়ে শুনতে হয়।
—
সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তটা এল একটু পরে। আমরা সবাই চুপচাপ হাঁটছিলাম, এমন সময় সামনে থাকা এক সহপাঠী হাত তুলে ইশারা করল। সবাই থেমে গেল। উপরের ডালে কিছু একটা নড়ল। তারপর দেখা গেল—একটা গিবন! দূরে, কিন্তু স্পষ্ট। তার চলাফেরা এত হালকা, এত স্বাভাবিক, যেন গাছগুলোই তার রাস্তা।
“ভাই, এটা তো বইয়ের ছবি না—সত্যি সত্যি গিবন!”
আমাদের এক ক্লাসমেট এত জোরে ফিসফিস করল যে সবাই হাসি চেপে রাখলাম। কিন্তু সত্যি বলতে, আমাদের সবার অনুভূতিটা প্রায় একই ছিল। বইয়ে পড়া একটা প্রাণী হঠাৎ বাস্তবে, নিজের চোখের সামনে—এটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
—
ফেরার পথে বাসে আগের মতো চিৎকার-চেঁচামেচি ছিল না। সবাই একটু ক্লান্ত, একটু চুপচাপ। কেউ ছবি দেখছিল, কেউ ঘুমাচ্ছিল, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। আমি নোটবুক খুলে কয়েকটা কথা লিখে রাখলাম—“বনকে দূর থেকে সবুজ মনে হয়, কাছে গেলে বোঝা যায় এটা একটা ভাষা।”
আমি চাই, প্রত্যেক ভূগোল শিক্ষার্থী অন্তত একবার এমন একটা ফিল্ড ট্রিপ করুক। কারণ ক্লাসরুম আমাদের ধারণা দেয়, কিন্তু মাঠ আমাদের চোখ খুলে দেয়। মানচিত্রে যে সবুজ দাগ দেখি, সেটা আসলে পাখির ডাক, গাছের ছায়া, ভেজা মাটি, মানুষের দায়িত্ব, আর ভবিষ্যতের প্রশ্নে ভরা।
বাস যখন বাড়ির দিকে ফিরছিল, আমার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল: আমরা কি এই বনকে শুধু পড়ার বিষয় হিসেবে দেখব, নাকি বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও নেব?














Responses (0 )