রাস্তা শেষ হয়ে গেল হঠাৎ। কোনো সাইনবোর্ড নেই, কোনো নাটকীয় ঘোষণা নেই—শুধু পিচঢালা রাস্তা ধীরে ধীরে পানির নিচে ঢুকে গেছে। সামনে যেখানে গ্রাম থাকার কথা, সেখানে শুধু বিস্তীর্ণ ধূসর পানি। দূরে কিছু গাছের মাথা, একটা টিনের চাল, আর মাঝেমধ্যে ভেসে থাকা কলাগাছের কাণ্ড।
আমি ক্যামেরা অন করলাম, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারলাম না। “বন্ধুরা, আমরা এখন নেত্রকোনার বন্যাকবলিত এলাকায়…”—এই ধরনের বাক্য মুখে আনতে ইচ্ছা করছিল না। কারণ সামনে যা দেখছিলাম, সেটা শুধু “বন্যাকবলিত এলাকা” না। এটা ছিল মানুষের ঘর, রাস্তা, উঠান, ক্ষেত, স্মৃতি—সবকিছু পানির নিচে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, এখান থেকে নৌকা নিতে হবে। রাস্তা আর যাবে না, কিন্তু আমাদের যেতে হবে। স্থানীয় একজন মাঝি বললেন, “আরও ভেতরে গেলে বুঝবেন পানি কেমন উঠছে।” তার কণ্ঠে আতঙ্ক ছিল না। বরং এমন এক অভ্যস্ত শান্তি, যেটা শুনে আরও অস্বস্তি লাগে।
হিরো ইমেজ ক্যাপশন: নেত্রকোনার বন্যাকবলিত ভূদৃশ্য—পানির নিচে রাস্তা, দূরে ডুবে থাকা ঘরবাড়ি, উঁচু জায়গায় গবাদিপশু, আর নৌকা দিয়ে চলাচল করছে মানুষ।
নৌকা যখন ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল, তখন “flooded” শব্দটার আসল মানে চোখের সামনে খুলে গেল। সংবাদে আমরা দেখি—পানি উঠেছে, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ফসল নষ্ট। কিন্তু জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা আলাদা।
বন্যা মানে শুধু পানি না। বন্যা মানে অদ্ভুত এক নীরবতা। যেখানে রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেল চলার কথা, সেখানে শুধু নৌকার দাঁড়ের শব্দ। যেখানে উঠানে বাচ্চারা খেলত, সেখানে এখন হাঁটু বা কোমরসমান পানি। কোথাও ভেসে যাচ্ছে বাঁশের টুকরা, প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা বেড়ার অংশ। কোথাও গরু-মহিষ উঁচু বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, চোখে ক্লান্তি। কোথাও পরিবারগুলো টিনের চাল বা উঁচু বারান্দায় বসে আছে—কেউ কাপড় শুকাচ্ছে, কেউ রান্নার চেষ্টা করছে, কেউ শুধু তাকিয়ে আছে।
একটা বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম, মাটির চুলা পানির নিচে। পাশে একটা অস্থায়ী চুলা বানানো হয়েছে ইট তুলে। এক মা শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, আর তার পাশে শুকনো খাবারের ছোট প্যাকেট। ক্যামেরা তুলতে গিয়েও নামিয়ে ফেললাম। সব দৃশ্য ধারণ করার জন্য না; কিছু দৃশ্য শুধু সম্মান দিয়ে দেখতে হয়।
বন্যা এলাকায় ঘুরে আমাদের চোখে পড়া কিছু বিষয়:
- রাস্তার শেষ মাথাগুলো অস্থায়ী নৌকা ঘাটে পরিণত হয়েছে
- গবাদিপশু বাঁধ, স্কুলের উঁচু বারান্দা বা রাস্তার উঁচু অংশে রাখা হয়েছে
- অনেক বাড়ির নিচতলা ডুবে গিয়ে মানুষ ছাদ বা মাচায় আশ্রয় নিয়েছে
- ভাসমান আবর্জনা ও পচা জৈব পদার্থ পানির গন্ধ বদলে দিয়েছে
- টিউবওয়েল ও শৌচাগার ডুবে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হয়েছে
- শিশু ও বৃদ্ধদের চলাচল সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে
এক জায়গায় নৌকা থামালাম। পাশে অর্ধেক ডোবা ধানক্ষেত। একজন কৃষক বাঁশের মাচার ওপর বসে ছিলেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু কথা বলার ভঙ্গি শান্ত। তিনি বললেন, এই ধরনের পানি তিনি আগেও দেখেছেন—একবার না, কয়েকবার।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এবার কেমন লাগছে?”
তিনি একটু নদীর দিকের পানির দিকে তাকিয়ে বললেন—
“বন্যা নতুন না। পাঁচবার দেখছি বড় পানি। কিন্তু আগে পানি উঠত ধীরে, নামতও বুঝে। এবার মনে হইল, রাতের মধ্যে জায়গা বদলাইয়া গেল।”
তার এই কথাটা পুরো দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী observation হয়ে থাকল। কারণ বন্যার মাপ শুধু ফুট বা মিটারে হয় না। মানুষের মনে হয়—পানি কত দ্রুত এল, প্রস্তুতির সময় পেল কি না, গরু সরাতে পারল কি না, চাল-ডাল বাঁচল কি না, বাচ্চাকে কোথায় রাখবে।
নেত্রকোনার বন্যা বোঝার জন্য একটু ভূগোল জানা দরকার, কিন্তু খুব বেশি জটিল না। এই জেলা হাওর বেসিনের অংশ, যেখানে বর্ষায় চারপাশের পানি নিচু এলাকায় জমে যায়। উজান থেকে—বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে—ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী-খাল দিয়ে নেমে আসে। সেই পানি যখন স্থানীয় বৃষ্টি, নদীর উচ্চতা, নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা আর হাওরের নিচু ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিলে যায়, তখন পানি ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে অনেক মানুষের কাছে বন্যা বেশি তীব্র মনে হয়েছে কারণ পানি দ্রুত উঠেছে, কিছু জায়গায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেছে, আর আগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন চাপ তৈরি করেছে।
কিন্তু মাঠে দাঁড়িয়ে এই ব্যাখ্যা খুব ছোট মনে হয়। কারণ এখানে প্রতিটি বাড়ির আলাদা গল্প। কোথাও পরীক্ষার বই ভিজে গেছে। কোথাও হাঁস ভেসে গেছে। কোথাও বীজতলা নষ্ট। কোথাও বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা চাল এখন ত্রাণের সঙ্গে মিশে গেছে।
আমরা একটা পরিবারের সঙ্গে কথা বললাম যারা চরের মতো উঁচু জমির এক পাশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা জানতে চাইল, “আপনারা ভিডিও করলে কি সাহায্য আসবে?” প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু উত্তর দেওয়া কঠিন। আমি বললাম, “আমরা দেখাতে চাই কী হচ্ছে।” কথাটা বলার পর নিজেই বুঝলাম—দেখানো যথেষ্ট না, কিন্তু না দেখানোও অন্যায়।
ফেরার সময় নৌকা আবার সেই ডুবে যাওয়া রাস্তার দিকে ফিরছিল। বিকেলের আলো পানির ওপর পড়ছে। দূরে গাছের ছায়া লম্বা হচ্ছে। কোথাও একটা শিশু পানিতে ভাসমান বোতল ঠেলে খেলছে, যেন বন্যার মধ্যেও শৈশব নিজের জায়গা খুঁজে নেয়।
রাস্তার মাথায় ফিরে নেমে দেখি, আমাদের জুতা কাদা, কাপড় ভেজা, ক্যামেরার ব্যাটারি প্রায় শেষ। কিন্তু মাথার ভেতর আরও ভারী কিছু রয়ে গেল। আমরা কয়েক ঘণ্টা দেখলাম, লিখলাম, রেকর্ড করলাম, তারপর বেরিয়ে এলাম। কিন্তু যারা থাকল, তাদের জন্য পানি এখনও আছে। রাতও আছে। মশা আছে। খাবারের চিন্তা আছে। স্কুল বন্ধ আছে। ফসলের ক্ষতি আছে।
গাড়িতে উঠতে উঠতে পেছনে তাকালাম। রাস্তা এখনও পানিতে শেষ হয়ে আছে। মনে হলো, এই জায়গাগুলো মানচিত্রে শুধু flooded area হিসেবে চিহ্নিত হবে। রিপোর্টে ক্ষতির হিসাব আসবে—ঘর, জমি, রাস্তা, ফসল। কিন্তু কে গুনবে সেই রাতগুলো, যখন পরিবার ছাদে বসে পানি নামার অপেক্ষা করে? কে গুনবে সেই ভয়, যখন কৃষক বুঝতে পারে তার মৌসুম শেষ? কে গুনবে শিশুদের স্কুলে না যেতে পারা দিনগুলো?
নেত্রকোনার বন্যা আমাকে বিশেষজ্ঞ বানায়নি। আমি শুধু একজন সাক্ষী ছিলাম। কিন্তু সেই সাক্ষ্য আমাকে একটা প্রশ্ন দিয়ে ফিরিয়ে দিল—এই পানির আসল খরচ কে হিসাব করে?














Responses (0 )