কম্পিউটার ল্যাবের দরজা খুলতেই মনে হলো আমরা যেন কোনো পরীক্ষার হলে ঢুকিনি, বরং একটা ছোট মিশন কন্ট্রোল রুমে ঢুকেছি। সারি সারি মনিটর, প্রতিটি স্ক্রিনে স্যাটেলাইট ইমেজ, আর ১৫ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে আছে—কাজ একটাই: বাংলাদেশের চর দ্বীপগুলোকে প্রথমবারের মতো গ্লোবাল ম্যাপে ঠিকভাবে তুলে আনা।
কেউ মাউস জুম করছে, কেউ নদীর ধারে অস্পষ্ট রেখা ধরার চেষ্টা করছে, কেউ আবার পাশের বন্ধুকে জিজ্ঞেস করছে, “এটা কি রাস্তা, নাকি শুকনো খালের দাগ?” বাইরে সাধারণ একটা দুপুর, কিন্তু ল্যাবের ভেতরে মনে হচ্ছিল আমরা এমন জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করছি, যেগুলো দেশের মানচিত্রে আছে, কিন্তু পৃথিবীর অনেক ডিজিটাল ম্যাপে প্রায় অদৃশ্য।
হিরো ইমেজ ক্যাপশন: বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে OpenStreetMap mapathon—স্ক্রিনে স্যাটেলাইট ইমেজ, শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে চর দ্বীপ, বসতি ও ঘাট digitise করছে, সামনে Geo/OSM কমিউনিটির ব্যানার।
OpenStreetMap বা OSM খুব সহজভাবে বললে পৃথিবীর একটি উন্মুক্ত, কমিউনিটি-তৈরি মানচিত্র। এখানে যে কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে রাস্তা, ঘরবাড়ি, নদী, স্কুল, মসজিদ, ঘাট, সেতু—এমন নানা তথ্য যোগ করতে পারে। কেউ স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে digitise করে, কেউ মাঠে গিয়ে তথ্য যাচাই করে, কেউ নাম সংশোধন করে। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, এই ম্যাপ শুধু বড় শহরের জন্য না; ছোট গ্রাম, নদীর চর, পাহাড়ি পথ—সবকিছুর জন্যই জায়গা আছে।
আমাদের mapathon-এর লক্ষ্য ছিল নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের কয়েকটি কম ম্যাপড এলাকা। স্যাটেলাইট ইমেজে চরগুলো দেখতে অদ্ভুত সুন্দর—কোথাও বালুর ফালি, কোথাও সবুজ ফসলের জমি, কোথাও ছোট ছোট ঘরবাড়ির cluster। কিন্তু সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত অনুভূতিও ছিল। আমরা স্ক্রিনে যে জায়গাগুলো আঁকছিলাম, তার অনেকগুলোতে হয়তো আমরা কোনোদিন যাব না। তবুও সেখানে মানুষ থাকে, শিশু স্কুলে যায়, নৌকা ঘাটে ভিড়ে, বর্ষায় পানি ওঠে, আবার শুষ্ক মৌসুমে নতুন পথ তৈরি হয়।
একজন শিক্ষার্থী বলল, “স্যার, এই ঘরগুলো এত ছোট দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এগুলো তো কারও বাড়ি।” কথাটা শুনে ল্যাবের পরিবেশ একটু বদলে গেল। digitising তখন আর শুধু লাইন টানা না; এটা হয়ে গেল যত্নের কাজ। একটা ঘর ভুল জায়গায় আঁকা মানে শুধু ডেটা ভুল না, বাস্তবতার একটা ছোট অংশ ভুলভাবে দেখানো।
সবচেয়ে মজার বিতর্ক হলো unnamed water channel নিয়ে। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যাচ্ছে সরু পানির রেখা, কোথাও নদীর সঙ্গে যুক্ত, কোথাও আবার মৌসুমি খালের মতো। কিন্তু নাম কী দেব? কেউ বলল “খাল”, কেউ বলল “চ্যানেল”, কেউ বলল “local name না জানলে নাম দেওয়া ঠিক হবে না।” শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো—যেখানে নিশ্চিত নাম নেই, সেখানে নাম বানানো হবে না; শুধু feature type ঠিকভাবে দেওয়া হবে, আর পরে field verification বা local input দিয়ে নাম যোগ করা যাবে।
এই ছোট বিতর্কটাই আসলে mapathon-এর বড় শিক্ষা। মানচিত্র বানানো মানে শুধু দ্রুত কাজ করা না; মানচিত্র বানানো মানে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা। কারণ একবার ডেটা live হয়ে গেলে সেটা অনেকেই ব্যবহার করতে পারে—গবেষক, উন্নয়নকর্মী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল, এমনকি সাধারণ মানুষও।
সেদিন আমরা যে ধরনের feature digitise করেছি, তার মধ্যে ছিল—
- চর দ্বীপের আনুমানিক সীমানা
- ছোট ছোট বসতি ও ঘরবাড়ির cluster
- বাঁধ ও embankment-এর রেখা
- নৌকা ঘাট বা boat ghat
- মসজিদ ও স্থানীয় কমিউনিটি landmark
দুপুরের পর কাজের গতি আরও বেড়ে গেল। প্রথমে যারা একটু ভয় পাচ্ছিল—“ভুল হলে কী হবে?”—তারাই পরে সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে building footprint আঁকছিল। কেউ shortcut শিখে ফেলেছে, কেউ validation error ঠিক করছে, কেউ আবার নিজের edit live map-এ দেখতে বারবার refresh করছে।
একসময় এক শিক্ষার্থী চিৎকার করে উঠল—
“ভাই, আমার আঁকা ঘাটটা এখন ম্যাপে দেখা যাচ্ছে! মানে সত্যি সত্যি সবাই দেখতে পারবে?”
এই আনন্দটা খুব সংক্রামক। আমরা সবাই তার স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। ছোট্ট একটা ঘাট, নদীর ধারে। হয়তো বাস্তবে সেখানে প্রতিদিন মানুষ ওঠানামা করে, বাজারে যায়, স্কুলে যায়, হাসপাতালে যায়। আর এখন সেই জায়গাটা বিশ্বের উন্মুক্ত মানচিত্রে দৃশ্যমান।
বিকেলের দিকে চোখ একটু ক্লান্ত, হাত একটু ব্যথা, কিন্তু ল্যাবের energy কমেনি। বরং একটা ছোট কমিউনিটি তৈরি হয়ে গেছে। কেউ কারও ভুল ধরছে, কেউ প্রশংসা করছে, কেউ বলছে, “এই চরটা শেষ করে তারপর উঠব।” mapping sprint-এর এই অংশটাই সবচেয়ে সুন্দর—একসঙ্গে কাজ করলে অদৃশ্য জায়গাও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
দিন শেষে আমরা dashboard দেখে হিসাব করলাম। মোটামুটি কয়েক ঘণ্টার কাজের মধ্যে শিক্ষার্থীরা প্রায় ১,৮৫০টি map object যোগ করেছে—ঘরবাড়ি, ঘাট, embankment, রাস্তার অংশ, landmark, আর চর সীমানার মতো গুরুত্বপূর্ণ feature। সংখ্যাটা শুনে সবাই হাততালি দিল। কিন্তু আমার মনে হলো, আসল অর্জন শুধু সংখ্যায় না। আসল অর্জন হলো ১৫ জন শিক্ষার্থী বুঝেছে—mapping can be care. মানচিত্র বানানোও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক উপায় হতে পারে।
হয়তো কোনোদিন কোনো চর পরিবারের একজন মোবাইলে ম্যাপ খুলে নৌকা ঘাটের রাস্তা খুঁজবে। হয়তো কোনো গবেষক flood exposure বিশ্লেষণ করবে। হয়তো কোনো স্বেচ্ছাসেবী দল দুর্যোগের সময় দ্রুত পৌঁছানোর পথ দেখবে। আর সেই ম্যাপে থাকবে আজকের এই ল্যাবের কিছু লাইন, কিছু পয়েন্ট, কিছু মনোযোগী চোখের কাজ।
সেদিন কম্পিউটার বন্ধ করার সময় মনে হচ্ছিল—আমরা শুধু চর দ্বীপ digitise করিনি; আমরা বাংলাদেশের কিছু প্রান্তিক ভূগোলকে বলেছি, “তোমরাও মানচিত্রে আছো।”














Responses (0 )