Mapping the Hakaluki Haor: SUST Geography Department’s Wetland Field Campaign

SUST Geography students mapped the Hakaluki Haor’s wetland ecology and hydrology during an annual field course at one of Bangladesh’s most important freshwater basins.

0
Mapping the Hakaluki Haor: SUST Geography Department’s Wetland Field Campaign

নৌকাটা যখন ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে মাঝ হাওরের দিকে এগোতে শুরু করল, তখনই বুঝলাম—কাগজের মানচিত্র আসলে খুব ছোট জিনিস। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু পানি, আকাশ, আর দূরে দূরে ভেসে থাকা গ্রাম। হাকালুকি হাওরকে ক্লাসে আমরা কতবার মানচিত্রে দেখেছি, কতবার স্যাটেলাইট ইমেজে জলাভূমির সীমানা টেনেছি। কিন্তু নৌকার মাথায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখলাম, তখন মনে হলো—এই বিশালতাকে শুধু একটা নীল প্যাচ দিয়ে বোঝানো যায় না।

আমরা তখন সাস্টের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ফিল্ড ক্যাম্পেইনে। ব্যাগে GPS, নোটবুক, মাপজোখের দড়ি, পানির বোতল, শুকনো খাবার, আর সবার চোখে একধরনের অদ্ভুত উত্তেজনা। কেউ ছবি তুলছে, কেউ লাইফ জ্যাকেট ঠিক করছে, কেউ আবার নৌকার এক পাশে বসে পানি ছিটে না লাগার চেষ্টা করছে। কিন্তু হাওরে এসে শুকনো থাকা যে প্রায় অসম্ভব, সেটা আমরা প্রথম আধঘণ্টাতেই বুঝে গেলাম।

ছবি ক্যাপশন: হিরো ইমেজ: হাকালুকি হাওরের বিস্তীর্ণ পানির ওপর নৌকায় বসে GPS ও নোটবুক হাতে সাস্ট ভূগোল বিভাগের শিক্ষার্থীরা—চারপাশে আকাশ, পানি, আর মাঠপর্যায়ের কাজের উত্তেজনা।


প্রথম কাজ ছিল GPS পয়েন্ট নেওয়া। নৌকা যখন নির্দিষ্ট স্থানে থামে, একজন ডিভাইস ধরে কোঅর্ডিনেট পড়ে, আরেকজন নোটবুকে লিখে, আরেকজন মোবাইলে ব্যাকআপ রাখে। শুনতে সহজ, কিন্তু নৌকা যখন দুলছে, বাতাস বইছে, আর পাশ থেকে কেউ বলছে “এই দিকে একটু সরে বসো, পানি ঢুকছে!”—তখন GPS রিডিং নেওয়াও একটা ছোট অ্যাডভেঞ্চার।

আমাদের স্যার বারবার বলছিলেন, “ফিল্ডে ডেটা নেওয়া মানে শুধু সংখ্যা লেখা না, পরিবেশটা বুঝে লেখা।” কথাটা তখন পুরোপুরি বুঝিনি। পরে বুঝলাম, একই GPS পয়েন্ট বর্ষায় একরকম, শুষ্ক মৌসুমে আরেকরকম অর্থ বহন করে। হাওর স্থির নয়; এটা ঋতুর সঙ্গে বদলায়, মানুষের জীবিকার সঙ্গে বদলায়, নদী-খাল-বর্ষার পানির সঙ্গে বদলায়।

নৌকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্যার হাওরের জলপ্রবাহ নিয়ে ব্যাখ্যা করছিলেন। কোথা দিয়ে পানি আসে, কোথায় জমে থাকে, কোন অংশ আগে শুকায়, কোন অংশে গভীরতা বেশি—সবকিছু যেন চোখের সামনে একটা জীবন্ত মানচিত্র হয়ে উঠছিল। তিনি বললেন, হাওরকে শুধু “জলাভূমি” বললে ভুল হবে; এটা একসঙ্গে জলাধার, মাছের আবাস, পাখির আশ্রয়, কৃষির মৌসুমি ক্ষেত্র, আর মানুষের জীবনযাত্রার অংশ।

“মানচিত্রে যে নীল রং দেখো, মাঠে এসে বুঝবে—ওই নীলের ভেতরে মানুষের জীবন, মাছের পথ, পাখির ঘর আর পানির স্মৃতি লুকিয়ে আছে।”

স্যারের এই কথাটা আমাদের অনেকেরই নোটবুকে লেখা ছিল। শুধু তথ্য হিসেবে না, একটা অনুভূতি হিসেবে।


এক পর্যায়ে শুরু হলো গভীরতা মাপা। খুব আধুনিক কিছু না—একটা দড়ি, নিচে ওজন বাঁধা, আর দড়িতে মাপের চিহ্ন। আমরা পালা করে দড়ি নামাচ্ছিলাম। দড়ি যখন পানির নিচে নামতে নামতে হঠাৎ ঢিলে হয়ে যায়, বুঝতাম তলায় পৌঁছেছে। তারপর মাপ পড়ে লিখে নেওয়া।

কাজটা সহজ মনে হলেও, বাস্তবে বেশ মজার বিশৃঙ্খলা। কেউ দড়ি ঠিকভাবে ধরতে পারছে না, কারও হাত ভিজে যাচ্ছে, কেউ নৌকার কিনারায় বেশি ঝুঁকে পড়ায় সবাই একসঙ্গে চিৎকার করছে—“সাবধানে!” এক বন্ধু তো বলেই ফেলল, “আজকে ডেটার চেয়ে জুতা বাঁচানো কঠিন!” কিন্তু সেই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও আমরা জানতাম, এই মাপগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দিয়ে পরে হাওরের গভীরতার ধারণা তৈরি হবে, কোন অংশে পানি বেশি থাকে সেটা বোঝা যাবে।

আমাদের দল যে জিনিসগুলো মেপেছে বা ম্যাপ করেছে, তার মধ্যে ছিল—

  • GPS দিয়ে নির্বাচিত পয়েন্টের অবস্থান
  • পানির গভীরতা
  • জলজ উদ্ভিদের বিস্তার
  • পাখি দেখা যাওয়ার সম্ভাব্য এলাকা
  • বসতি, ঘাট ও নৌপথের অবস্থান

ভোরের হাওর আলাদা এক জগৎ। দিনের কাজের আগে এক সকালে আমরা খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিলাম। তখন বাতাসে কাঁচা পানি আর ভেজা মাটির গন্ধ। কোথাও কোথাও জলজ উদ্ভিদের গন্ধ মিশে আছে, আবার দূরের কোনো রান্নার ধোঁয়াও ভেসে আসছে। আকাশ তখন হালকা নীল-ধূসর, আর সেই আকাশ পানিতে এমনভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল আমরা আকাশের ওপর দিয়ে নৌকা চালাচ্ছি।

পাখির শব্দ ছিল সবচেয়ে সুন্দর। একসঙ্গে অনেক পাখির ডাক, কিন্তু কোনোটা বিরক্তিকর না। দূরে ডানার শব্দ, কাছে পানির ওপর হালকা ছলাৎ ছলাৎ, মাঝে মাঝে মাছ লাফিয়ে ওঠার শব্দ। আমরা কেউ কেউ চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ কিছু দৃশ্য আছে, যেগুলো নিয়ে বেশি কথা বললে সৌন্দর্যটা কমে যায়।

সেদিন বুঝলাম, ভূগোল শুধু লেকচার স্লাইড না। ভূগোল হলো ভোরের গন্ধ, নৌকার দুলুনি, ভেজা নোটবুক, ভুল করে নেওয়া পয়েন্ট আবার ঠিক করা, আর একসঙ্গে কাজ করতে করতে একটা জায়গাকে নতুন চোখে দেখা।


ক্যাম্পেইন শেষে আমরা যখন ডিপার্টমেন্টে ফিরে ডেটা সাজাচ্ছিলাম, তখন মাঠের এলোমেলো নোটগুলো ধীরে ধীরে মানচিত্রে রূপ নিতে লাগল। GPS পয়েন্টগুলো স্ক্রিনে বসছে, গভীরতার তথ্য লেয়ার হচ্ছে, নৌপথ আর ঘাটের অবস্থান আলাদা করে দেখা যাচ্ছে। যে হাওরকে আমরা নৌকা থেকে অসীম মনে করেছিলাম, সেটাই এখন GIS আর্কাইভে সংরক্ষিত হচ্ছে—ভবিষ্যৎ গবেষণা, তুলনা, আর শিক্ষার্থীদের শেখার জন্য।

এই ভেবে খুব গর্ব হচ্ছিল যে আমাদের ভেজা জুতা, কাঁপা হাতে নেওয়া GPS রিডিং, আর দড়ি দিয়ে মাপা গভীরতা—সব মিলিয়ে সাস্ট ভূগোল বিভাগের ওয়েটল্যান্ড GIS আর্কাইভের অংশ হয়ে গেল। হাকালুকি হাওর আমাদের কাছে আর শুধু একটা নাম না; এটা এখন মাঠে দেখা, হাতে মাপা, মনে রাখা একটা জীবন্ত ভূগোল।

Mrittika RoyM
WRITTEN BY

Mrittika Roy

Lecturer in natural resources and biogeography at Sylhet Agricultural University. Research focuses on the haor wetland ecosystems of northeastern Bangladesh — mapping biodiversity corridors, seasonal flooding dynamics, and conservation-critical habitats. Dedicated to making geo-science relevant to the communities living within these landscapes.

Responses (0 )



















Related posts