নৌকাটা সুরমা নদীর মাঝামাঝি এসে থামতেই আমাদের দলের মধ্যে ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। একজন current meter পানিতে নামাচ্ছে, আরেকজন স্টপওয়াচ ধরেছে, তৃতীয়জন নোটবুক নিয়ে প্রস্তুত—কিন্তু সবাই একসঙ্গে প্রশ্ন করছে, “রিডিংটা ঠিক আসছে তো?”
নদী অবশ্য আমাদের এই বিভ্রান্তিতে মোটেও আগ্রহী ছিল না। সে নিজের মতো steady ভাবে বয়ে চলেছে। পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ, দূরে চর, আর দুই পাশে সুনামগঞ্জের পরিচিত নদীজীবন। আমরা নৌকায় দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান করার চেষ্টা করছি, আর সুরমা যেন বলছে—“তোমরা মাপো, আমি চলি।”
হিরো ইমেজ ক্যাপশন: সুরমা নদীর ওপর নৌকায় দাঁড়িয়ে ভূগোল বিভাগের শিক্ষার্থীরা current meter দিয়ে নদীর প্রবাহ মাপছে—একজন নোট নিচ্ছে, একজন যন্ত্র ধরে আছে, আর পেছনে সুনামগঞ্জের নদীভূমি।
সেদিনের কাজ ছিল river discharge বা নদীর প্রবাহমাত্রা মাপা। ক্লাসে আমরা বিষয়টা আগেও পড়েছি, কিন্তু নদীর ওপর দাঁড়িয়ে সেটা করা একদম আলাদা অভিজ্ঞতা। বোর্ডে লেখা সূত্র সহজ লাগে, কিন্তু নৌকা যখন দুলছে, যন্ত্র পানিতে কাঁপছে, আর স্রোত নিজের মতো টানছে—তখন বোঝা যায় মাঠের বিজ্ঞান কতটা জীবন্ত।
আমাদের স্যার খুব সহজ করে বললেন, নদীর discharge মানে নির্দিষ্ট সময়ে নদী দিয়ে কত পরিমাণ পানি যাচ্ছে। সবচেয়ে সহজ ধারণাটা হলো:
Q = V × A
এখানে Q হলো discharge, V হলো পানির গড় বেগ, আর A হলো নদীর cross-section বা প্রস্থ ও গভীরতার ভিত্তিতে তৈরি পানির কাটাছবি। সহজ কথায়—নদীর “কত বড় মুখ” দিয়ে “কত দ্রুত” পানি যাচ্ছে, সেটাই discharge।
প্রথমে আমরা নদীর একটি cross-section বেছে নিলাম। নৌকা ধীরে ধীরে এক পাড় থেকে আরেক পাড়ের দিকে গেল। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর আমরা গভীরতা মাপলাম, তারপর current meter দিয়ে পানির বেগ নেওয়া হলো। কোথাও স্রোত বেশি, কোথাও কম। কোথাও পানি গভীর, কোথাও তুলনামূলক অগভীর। নদী বাইরে থেকে একরকম দেখালেও ভেতরে তার চলাচল একদম সমান না—এটা সেদিন খুব পরিষ্কার বোঝা গেল।
নৌকার মাঝি কাকা আমাদের কাজ দেখে মুচকি হাসছিলেন। আমরা যখন তৃতীয়বার একই রিডিং নিয়ে তর্ক করছি, তিনি বললেন—
“এই বছর নদীর টান আলাদা লাগে। আগের বছর এই সময় পানি এত ভারী মনে হয় নাই।”
তার কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু আমাদের নোটবুকের সংখ্যাগুলোর পাশে যেন আরেকটা বাস্তবতা যোগ করল। আমরা যন্ত্র দিয়ে বেগ মাপছি, আর তিনি বছরের পর বছর শরীর দিয়ে নদীর মেজাজ পড়ছেন। দুটো জ্ঞানই গুরুত্বপূর্ণ।
নৌকা থেকে river discharge মাপার আমাদের ফিল্ড প্রক্রিয়াটা মোটামুটি এমন ছিল:
- নদীর একটি নিরাপদ ও প্রতিনিধিত্বশীল cross-section নির্বাচন করা
যেখানে নৌকা স্থির রাখা যায় এবং দুই পাড়ের অবস্থান বোঝা যায়।
- প্রস্থ ভাগ করে নির্দিষ্ট interval ঠিক করা
যেমন প্রতি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর মাপ নেওয়া হবে।
- প্রতিটি পয়েন্টে গভীরতা মাপা
দড়ি, sounding rod বা depth device দিয়ে পানির গভীরতা নেওয়া।
- current meter দিয়ে পানির বেগ মাপা
নির্দিষ্ট গভীরতায় যন্ত্র ধরে velocity reading নেওয়া।
- সব পয়েন্টের হিসাব মিলিয়ে মোট discharge বের করা
প্রতিটি ছোট অংশের area ও velocity মিলিয়ে শেষে মোট প্রবাহমাত্রা হিসাব করা।
সবচেয়ে মজার মুহূর্ত ছিল যখন সংখ্যাগুলো ধীরে ধীরে “অর্থ” পেতে শুরু করল। প্রথমে মনে হচ্ছিল আমরা শুধু গভীরতা, বেগ, দূরত্ব—এসব আলাদা আলাদা সংখ্যা লিখছি। কিন্তু পরে যখন স্যার বোর্ডের মতো করে নৌকার ডেকে কাগজে হিসাব দেখালেন, তখন বুঝলাম এই সংখ্যাগুলো মিলে নদীর একটা বাস্তব ছবি তৈরি করছে।
“এই discharge value শুধু একটা সংখ্যা না,” স্যার বললেন। “এটা বলে দেয়, এই মুহূর্তে নদী কত পানি বহন করছে। বর্ষা মৌসুমে এই মান বাড়তে থাকলে নিচু এলাকা, চর, ঘাট, কৃষিজমি—সবকিছুর ঝুঁকি বদলে যায়।”
সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে flood season মানে শুধু সংবাদ শিরোনাম না; এটা মানুষের ঘর, স্কুল, রাস্তা, ফসল, গবাদিপশু, বাজার—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। নদীর পানি কত দ্রুত বাড়ছে, কত প্রবাহ আসছে, কোথায় চাপ তৈরি হচ্ছে—এসব বুঝতে discharge data খুব দরকার। আমরা যে রিডিং নিচ্ছিলাম, সেটা হয়তো ছোট একটা exercise, কিন্তু এর পেছনে বড় প্রশ্ন আছে: সময়মতো সতর্কতা দেওয়া যাবে কি?
দুপুরের দিকে আমরা কাছের এক চরে নেমেছিলাম। সেখানে কয়েকটা ঘর, বাঁশের বেড়া, শুকাতে দেওয়া কাপড়, আর উঠানে বসে থাকা একটা পরিবার। আমাদের দেখে তারা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এল। একজন মাঝবয়সী মানুষ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা নদীর পানি মাপতেছেন? এই ডাটা দিয়া কি আগে থেকে বন্যার খবর পাওয়া যাবে?”
প্রশ্নটা শুনে আমরা একটু চুপ করে গেলাম। কারণ উত্তরটা সহজ না। আমাদের স্যার খুব শান্তভাবে বললেন, “একটা দিনের মাপ দিয়ে সব বলা যায় না। কিন্তু নিয়মিত মাপ, আগের ডাটা, বৃষ্টির তথ্য—সব মিললে flood warning ভালো করা যায়।”
লোকটা মাথা নাড়লেন। তার পাশে দাঁড়ানো ছোট ছেলে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই মুহূর্তে river discharge আর শুধু ক্লাসের topic থাকল না। এটা হয়ে গেল মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ফিল্ডওয়ার্ক শেষে ডিপার্টমেন্টে ফিরে আমাদের ডেটা clean করা হলো, cross-section profile আঁকা হলো, velocity table তৈরি হলো, আর discharge হিসাবটা final report-এ ঢুকল। পরে সেটা বিভাগের hydrology field archive-এ যুক্ত হলো, যাতে ভবিষ্যতের batch একই জায়গার ডেটার সঙ্গে তুলনা করতে পারে।
আমার কাছে সবচেয়ে বড় শেখা ছিল—নদী মাপা মানে শুধু যন্ত্র চালানো না। এটা একদিকে technical কাজ: reading, calculation, accuracy, method। কিন্তু অন্যদিকে এটা human কাজও: মাঝির অভিজ্ঞতা শোনা, চরের মানুষের ভয় বোঝা, flood season-এর বাস্তবতা অনুভব করা।
সেদিন সুরমা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে বুঝলাম, একটা নদীকে পুরোপুরি বোঝা যায় না শুধু দূর থেকে দেখে। তার স্রোতে যন্ত্র নামাতে হয়, তার পাড়ের মানুষের কথা শুনতে হয়, আর নিজের নোটবুকের সংখ্যাগুলোর পাশে একটু মানবিকতা রাখতে হয়। নদী তখন শুধু পানি না—একটা চলমান জীবনব্যবস্থা।














Responses (0 )