কৃষকটি খুব ধীরে দড়ির বালতিটা কুয়োর ভেতর নামালেন। আমরা সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দড়ি নামছে, নামছে, আরও নামছে—কিন্তু সেই পরিচিত “ছপ” শব্দটা হলো না। একটু পর তিনি দড়ি টেনে তুললেন। বালতিটা উঠে এল প্রায় শুকনো। তলায় সামান্য কাদা, কয়েক ফোঁটা পানি, আর তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি—যেটা হতাশা না, অবাকও না; বরং বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্লান্তি।
তিনি বললেন, “আগে এই কুয়ায় কখনো এমন হইত না।”
বারিন্দ অঞ্চলে আমাদের ফিল্ড ভিজিটের শুরুটা ছিল এই দৃশ্য দিয়ে। কোনো বড় বক্তৃতা না, কোনো গ্রাফ না, কোনো রিপোর্ট না—শুধু একটা শুকনো বালতি। আর সেই বালতিটাই যেন পুরো দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী তথ্য।
হিরো ইমেজ ক্যাপশন: বারিন্দ কৃষি অঞ্চলের এক শুকনো কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে একজন কৃষক—হাতে দড়ির বালতি, চারপাশে ফেটে যাওয়া মাটি, দূরে ধানক্ষেতের বদলে শুকনো জমির রেখা।
বারিন্দের ভূদৃশ্য বাংলাদেশের অনেক জায়গার মতো নরম সবুজ না। এখানে মাটির রং আলাদা—লালচে-বাদামি, কোথাও ধূসর, কোথাও শক্ত হয়ে ফেটে যাওয়া। মাঠে হাঁটলে পায়ের নিচে মাটি ভাঙার শব্দ হয়। শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ধুলো থাকে, আর দূরে দূরে পাম্পের শব্দ ভেসে আসে।
ভোর ৪টার দিকে গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটলে একটা অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়—ডিজেল পাম্পের গম্ভীর গর্জন। তখনও আকাশ অন্ধকার, কিন্তু পানি তোলার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কৃষকরা জানেন, দিনের গরম ওঠার আগে সেচ দিতে হবে। কেউ পাম্পের পাশে বসে আছে, কেউ পাইপ ঠিক করছে, কেউ পানি জমির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাচ্ছে কি না দেখছে।
এই শব্দে একটা জরুরি ভাব আছে। যেন মাটির নিচে থাকা পানি আর মাঠের ফসলের মধ্যে প্রতিদিন নতুন করে দর-কষাকষি চলছে।
আমরা কয়েকটি পুরনো shallow well দেখতে গেলাম। অনেকগুলোই এখন আর ব্যবহার হয় না। কুয়োর চারপাশে ফেটে যাওয়া মাটি, ভাঙা ইট, শুকনো আগাছা। কোথাও পুরনো পাম্প পড়ে আছে, মরিচা ধরা। স্থানীয়রা বললেন, আগে এসব অগভীর কুয়ো বা নলকূপ দিয়েই অনেক কাজ চলত। এখন অনেক জায়গায় গভীর নলকূপ ছাড়া উপায় নেই। পানি নিচে নেমে গেছে—এই কথাটা সবাই জানে, কিন্তু কেউ খুব নাটকীয়ভাবে বলে না। যেন এটা ধীরে ধীরে মেনে নেওয়া এক বাস্তবতা।
বারিন্দে মাঠে ঘুরে যে লক্ষণগুলো বারবার চোখে পড়ল:
- পুরনো অগভীর কুয়ো ও নলকূপের অকার্যকর হয়ে যাওয়া
- পাম্প চালানোর সময় বেড়ে যাওয়া, কিন্তু পানির চাপ কমে যাওয়া
- জমির মাটিতে ফাটল ও শক্ত, শুকনো পৃষ্ঠ
- ধানক্ষেতের পাশে অনাবাদি বা কম চাষ হওয়া জমির সংখ্যা বাড়া
- কৃষকদের গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়া
একজন কৃষকের সঙ্গে আমরা তার জমির পাশে বসে কথা বলছিলাম। বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে। তিনি বললেন, এই জমিতে তার বাবা ধান করতেন, তিনিও করেছেন, এখন তার ছেলে করতে চায় কি না—সেটা নিয়েই সন্দেহ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আগের সঙ্গে এখন সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?”
তিনি একটু দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আগে পানি চাইলে পাওয়া যাইত। এখন পানি ডাকলেও আসে না। আগে কুয়া ছিল, পরে পাম্প লাগল, এখন গভীর পাম্প লাগে। জমি একই আছে, কিন্তু পানির মন বদলাইছে।”
“পানির মন বদলাইছে”—কথাটা শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম। কোনো technical term নেই, কিন্তু এর ভেতরে বিশ বছরের পরিবর্তন আছে। আগে পানি ছিল কাছাকাছি, এখন গভীরে। আগে সেচ ছিল কাজের অংশ, এখন সেচ নিজেই বড় চিন্তা। আগে কৃষক আকাশের দিকে তাকাতেন বৃষ্টির জন্য, এখন মাটির নিচের পানির দিকেও তাকাতে হয়—যদিও সেটা চোখে দেখা যায় না।
বারিন্দ অঞ্চলকে বুঝতে হলে একটা ছোট hydrology background দরকার। বাংলাদেশের অনেক অংশে নদী, বন্যা ও বর্ষার পানিতে ভূগর্ভস্থ জলস্তর তুলনামূলক দ্রুত recharge হয়। কিন্তু বারিন্দ তুলনামূলক উঁচু, পুরনো ও শুষ্ক প্রকৃতির এলাকা। এখানে ভূগর্ভস্থ aquifer আছে, কিন্তু intensive irrigation—বিশেষ করে বোরো ধানের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে গভীর নলকূপে পানি তোলা—যে গতিতে পানি নিচ্ছে, recharge সবসময় সেই গতিতে ফিরে আসতে পারছে না। তাই বছর বছর water table নিচে নামার চাপ তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু মাঠে দাঁড়িয়ে এই ব্যাখ্যাটা শুধু পেছনের গল্প। সামনে আছে মানুষ। সামনে আছে কৃষকের হিসাব—ডিজেলের দাম, বিদ্যুৎ, পাম্পের ভাড়া, সেচের পালা, ফসলের দাম, ঋণ। পানি কমে গেলে শুধু মাটি শুকায় না; মানুষের সিদ্ধান্তও বদলে যায়। ধান করবে, নাকি অন্য ফসল? জমি রাখবে, নাকি ছেড়ে দেবে? ছেলে কৃষিতে থাকবে, নাকি শহরে যাবে?
দুপুরের দিকে আমরা একটা জমিতে গেলাম যেখানে আগের বছর বোরো ধান হয়েছিল, কিন্তু এ বছর কৃষক দ্বিধায় আছেন। জমি প্রস্তুত করা যায়, বীজ পাওয়া যায়, শ্রমিক পাওয়া যায়—কিন্তু পানি? এই প্রশ্নটাই সবকিছুকে থামিয়ে দেয়।
মাঠের পাশে একটা পুরনো আমগাছের ছায়ায় আমরা বসেছিলাম। কৃষক বললেন, “ধান না করলে মন মানে না। কিন্তু পানি না থাকলে মন দিয়া কী করুম?” কথাটা শুনে মনে হলো, কৃষি শুধু অর্থনীতি না; এটা অভ্যাস, পরিচয়, পারিবারিক স্মৃতি। কিন্তু জলস্তর নিচে নামলে সেই পরিচয়ও চাপের মুখে পড়ে।
বিকেলের দিকে আলো নরম হয়ে এলো। সূর্য যখন মাঠের ওপর কমলা আলো ফেলছিল, শুকনো মাটির ফাটলগুলো আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছিল। দূরে একটা পাম্প এখনও চলছিল, কিন্তু শব্দটা যেন ক্লান্ত। আমরা সেই কৃষকের সঙ্গে বসে ছিলাম। কথা কমে গেছে। কেউ নোট নিচ্ছে না, কেউ ছবি তুলছে না। শুধু মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকা।
সেই মাঠে হয়তো আগামী বছর ধান হবে, হয়তো হবে না। হয়তো অন্য ফসল আসবে। হয়তো জমি কিছুদিন খালি থাকবে। হয়তো আরও গভীর নলকূপ বসবে। কোনো উত্তর সহজ না।
বারিন্দ থেকে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, water table নামা কোনো একদিনের দুর্যোগ না। এটা ধীরে ধীরে জমা হওয়া সংকট—একটা শুকনো বালতি, একটা abandoned কুয়ো, একটা পাম্পের দীর্ঘ শব্দ, একটা কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।
আর দিনের শেষে প্রশ্নটা খুব শান্তভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়: পানি যদি আরও নিচে নামে, তাহলে এই মাঠগুলোর পরের গল্প কী হবে?














Responses (0 )