হিরো ইমেজ ক্যাপশন: জোয়ার-ভাটার সরু খালে নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে এক জিও ভ্লগার—দুই পাশে সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ দেয়াল, হাতে ক্যামেরা, চোখে বিস্ময়।
Day 1 — মংলা থেকে যাত্রা, আর মানচিত্রের বাইরে ঢুকে পড়া
ক্যামেরা অন। বাতাসে নদীর গন্ধ। পেছনে মংলার ঘাট ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের লঞ্চ যখন নদীর বুক চিরে সুন্দরবনের দিকে এগোতে শুরু করল, তখন মনে হচ্ছিল—আজ আমরা শুধু ভ্রমণে যাচ্ছি না, বাংলাদেশের সবচেয়ে রহস্যময় ভূগোলের ভেতরে ঢুকে পড়ছি।
ডেকে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে শুধু পানি দেখছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে দুই পাশে সবুজ রেখা ঘন হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সেই রেখা যেন দেয়ালে পরিণত হলো—ম্যানগ্রোভের দেয়াল। সুন্দরী, গেওয়া, গরান—নামগুলো আগে বইয়ে পড়েছি, কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, এগুলো শুধু গাছ না; এগুলো জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বেঁচে থাকা একেকটা সৈনিক।
“বন্ধুরা, এই যে দেখছেন, এটাই আসল সুন্দরবন এন্ট্রি ভাইব!”—মনে মনে ইউটিউব ভ্লগের মতো বললাম, যদিও বাস্তবে এত নাটকীয়ভাবে বলার সাহস হয়নি। কারণ চারপাশের নীরবতা নিজেই অনেক বড় কনটেন্ট।
দুপুরের পর আমরা একটা সরু tidal creek বা জোয়ারি খালে ঢুকলাম। খালটা যত ভেতরে যাচ্ছিল, তত সরু হচ্ছিল। লঞ্চের দুই পাশে গাছের শ্বাসমূল দেখা যাচ্ছিল—মাটির ভেতর থেকে ছোট ছোট কাঠির মতো উঠে আছে। মনে হচ্ছিল, বন নিজেই শ্বাস নিচ্ছে। পানির রং ঘোলা, কিন্তু তার মধ্যে আকাশের আলো মিশে একটা অদ্ভুত সোনালি-সবুজ ছায়া তৈরি করছিল।
সন্ধ্যার আগে আমরা নৌকার ডেকে রাতের থাকার ব্যবস্থা করলাম। কেউ স্লিপিং ব্যাগ খুলছে, কেউ ক্যামেরা চার্জ দিচ্ছে, কেউ আবার চা হাতে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবন অন্যরকম হয়ে গেল। দূরে কোথাও পাখির ডাক, পানিতে হালকা ঢেউ, আর মাঝে মাঝে অজানা কোনো শব্দ। শহরে রাত মানে আলো; এখানে রাত মানে অন্ধকারের ভেতর শুনতে শেখা।
ডেকে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—এই বনের মানচিত্র আঁকা যায়, কিন্তু এর অনুভূতি আঁকা যায় না।
Day 2 — কাদায় পায়ের ছাপ, মধু সংগ্রাহকের গল্প, আর ওয়াচ টাওয়ারের সূর্যাস্ত
সকালে ঘুম ভাঙল ইঞ্জিনের শব্দে না, পাখির ডাকে। পানির ওপর তখন হালকা কুয়াশা। নৌকার পাশে ছোট ছোট ঢেউ এসে লাগছে। চায়ের কাপ হাতে ডেকে দাঁড়িয়ে মনে হলো, সুন্দরবনের সকাল আসলে খুব ধীরে শুরু হয়—কিন্তু একবার শুরু হলে সব ইন্দ্রিয় একসঙ্গে জেগে ওঠে।
আজ আমাদের forest walk। সঙ্গে forest guard। তিনি খুব শান্ত মানুষ, কিন্তু তার চোখ সবসময় চারপাশে ঘুরছে। আমরা কাঠের পথ ধরে হাঁটছিলাম, তারপর একটু কাদামাটির অংশে নামলাম। কাদা নরম, পা ফেললেই চুপচাপ বসে যাচ্ছে। হঠাৎ গার্ড থামলেন। নিচু হয়ে কাদার দিকে দেখালেন।
টাইগার pug mark।
আমরা সবাই একসঙ্গে চুপ। কাদার মধ্যে বড়, গোল, স্পষ্ট পায়ের ছাপ। বাঘকে দেখিনি, কিন্তু তার উপস্থিতি যেন পুরো বাতাসে ছড়িয়ে গেল। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, সুন্দরবনে বাঘ শুধু প্রাণী না—একটা অদৃশ্য শক্তি। সে না থাকলেও সে আছে।
“সুন্দরবনে আপনি বাঘকে দেখবেন কি না জানি না, কিন্তু বাঘ আপনাকে দেখেছে কি না—সেটা কখনো নিশ্চিত বলা যায় না।”
ফরেস্ট গার্ডের এই কথাটা আমার মাথায় গেঁথে গেছে। একটু ভয়, একটু শ্রদ্ধা, আর অনেকটা বিস্ময়—সব একসঙ্গে।
দুপুরের দিকে আমাদের দেখা হলো এক মধু সংগ্রাহকের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, কীভাবে মৌসুমে তারা বনে ঢোকেন, কীভাবে দল বেঁধে কাজ করেন, আর কীভাবে বনকে ভয় করেও ভালোবাসেন। তার গল্পে কোনো সিনেমাটিক হিরোইজম ছিল না; ছিল বাস্তব জীবন। তিনি বললেন, “বন দিলে খাই, বন না দিলে ফিরি।” কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যে সুন্দরবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
এই দিনের কিছু wildlife sightings আমাদের পুরো ট্রিপকে আরও জীবন্ত করে দিল:
- চিত্রা হরিণ
- বানর
- কুমির
- মাছরাঙা
- বক
- কাদার ওপর বাঘের পায়ের ছাপ
বিকেলে আমরা ওয়াচ টাওয়ারে উঠলাম। ওপরে উঠে যে দৃশ্যটা দেখলাম, সেটা ক্যামেরায় পুরো ধরা যায় না। সামনে নদী, তার পাশে কেওড়া-গেওয়ার সবুজ, দূরে আরও বন, আর আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে কমলা হয়ে নামছে। নিচের পানি সেই আলো ধরে রাখছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো সুন্দরবন দিনের শেষ আলোটা নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখছে।
সেদিন রাতে ডেকে বসে সবাই একটু কম কথা বলছিল। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো বাঘের পায়ের ছাপ, হয়তো বনকে নতুনভাবে বুঝতে শুরু করা।
Day 3 — ভোরের পানি, ফিরে আসার পথ, আর তিন দিনে বদলে যাওয়া চোখ
শেষ দিনের ভোরে আমি ইচ্ছে করেই একটু আগে উঠে গেলাম। ডেক তখন প্রায় খালি। লঞ্চ ধীরে ধীরে চলছিল, পানি কেটে এগোচ্ছিল। চারপাশে নরম আলো। সুন্দরবনের ভোরে কোনো তাড়াহুড়া নেই। শুধু পানি, পাখি, গাছ, আর দূরে অদৃশ্য জোয়ারের টান।
ফিরতি পথে মংলার দিকে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, আমরা একই নদী দিয়ে ফিরছি, কিন্তু আমরা আর আগের মানুষ নেই। Day 1-এ আমি সুন্দরবনকে “দেখতে” এসেছিলাম। Day 3-এ মনে হলো, সুন্দরবন আমাকে দেখতে শিখিয়েছে।
আগে ম্যানগ্রোভ মানে আমার কাছে ছিল পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর—লবণাক্ত পরিবেশ, শ্বাসমূল, জোয়ার-ভাটা। এখন ম্যানগ্রোভ মানে কাদায় পায়ের ছাপ, নৌকার ডেকের রাত, গার্ডের সতর্ক চোখ, মধু সংগ্রাহকের গল্প, আর সেই অদ্ভুত অনুভূতি—যে বনকে আমরা যতটা বুঝি ভাবি, বন তার চেয়ে অনেক বড়।
মংলার ঘাট কাছে আসছিল। মোবাইলে নেটওয়ার্ক ফিরল, সবাই আবার মেসেজ চেক করতে শুরু করল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, এই তিন দিনের কিছু অংশ অফলাইনে রাখাই ভালো। সবকিছু পোস্ট করার জন্য না; কিছু অভিজ্ঞতা নিজের ভেতরে রাখার জন্য।
প্রতিটি জিওগ্রাফি শিক্ষার্থীর সুন্দরবনে অন্তত একবার যাওয়া উচিত। কারণ এখানে বইয়ের geography মাঠের geography হয়ে যায়। নদী, জোয়ার, পলি, বন, প্রাণী, মানুষ—সব একসঙ্গে কাজ করে। সুন্দরবন শেখায়, ভূগোল কোনো আলাদা বিষয় না; এটা জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক চলমান গল্প।
আর হ্যাঁ, যারা যাবে—ভালো টর্চ, অতিরিক্ত মোজা, পাওয়ার ব্যাংক, মশা প্রতিরোধক, আর waterproof bag অবশ্যই নেবে। আমি সব নিয়েছিলাম ভাবছিলাম, কিন্তু waterproof bag নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফলাফল: নোটবুকের অর্ধেক পৃষ্ঠা এখন সুন্দরবনের পানির স্মৃতি বহন করছে।
তবুও, ওই ভেজা পৃষ্ঠাগুলোই হয়তো সবচেয়ে সত্যি।














Responses (0 )